দুশ্চিন্তা, বিপদ ও দুঃখের দু‘আ
ইউনুসের দু‘আ, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয়, বিপদের দু‘আ, আর ধৈর্য ও স্বস্তির আয়াত, সাবীল লাইব্রেরি ও কুরআন থেকে, প্রতিটি সূত্রের তালিকাসহ।
এআই-এর লেখা · আলেমদের পর্যালোচনা বাকি আছে
এই প্রবন্ধের কথাগুলো সাবীল লাইব্রেরি ও তার উৎসগুলো থেকে এআই লিখেছে, এবং এআই-ই সেগুলোর সাথে মিলিয়ে তা যাচাই করেছে। কোনো আলেম এখনও এটি পর্যালোচনা করেননি। আরবি পাঠ, সেগুলোর অর্থ ও সেগুলোর সূত্র লাইব্রেরি ও কুরআনের নিজস্ব, সেখানে যেমন আছে হুবহু তেমনই দেখানো। নিজের অবস্থার ব্যাপারে ফতোয়ার জন্য একজন যোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
প্রকাশিত ৩ অক্টোবর, ২০২৬হালনাগাদ ২১ অক্টোবর, ২০২৬পড়তে ১০ মিনিট
দুশ্চিন্তা, বিপদ বা দুঃখে মন যখন ভারী হয়ে থাকে, তখন বলার মতো কথা কুরআন ও হাদীসেই আছে। এই পাতায় সাবীল লাইব্রেরিতে দুশ্চিন্তা ও দুঃখের শিরোনামে রাখা দু‘আগুলো, আর কষ্ট, ধৈর্য ও স্বস্তি নিয়ে কুরআনের কয়েকটি আয়াত এক জায়গায় আনা হয়েছে। প্রতিটি দু‘আ তার আরবি, উচ্চারণ, অর্থ এবং লাইব্রেরির দেওয়া সূত্র ও মানসহ দেখানো হয়েছে; যেসব হাদীস থেকে এগুলো এসেছে, শেষে সেগুলোর নম্বর দেওয়া আছে। কিছু আয়াতের নিচে সংস্করণের নিজের টীকাও দেখানো হয়; সেগুলো সংস্করণের নিজের কথা, এই পাতার নয়। নিজের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করুন; আর ভার যদি কথায় বহন করার চেয়ে বেশি হয়, কাছের কারও সঙ্গেও কথা বলুন।
কষ্ট নিয়ে কুরআন যা বলে
কুরআন স্পষ্ট করে বলে, মানুষকে পরীক্ষা করা হবে ভয়, ক্ষুধা আর ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে; আর ধৈর্যশীলদের পরিচয় দেয় এভাবে: বিপদ এলে তারা বলে, আমরা আল্লাহরই, আর তাঁর দিকেই ফিরে যাব। তাদের সম্পর্কে বলে, তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত।
আর আমরা তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব [১] কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে--
[১] কোনো বিপদে পতিত হওয়ার আগেই যদি সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে দেয়া হয়, তবে সে বিপদে ধৈর্যধারণ সহজতর হয়ে যায়। কেননা হঠাৎ করে বিপদ এসে পড়লে পেরেশানী অনেক বেশী হয়। যেহেতু আল্লাহ্ তা'আলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করেই পরীক্ষার কথা বলেছেন, সেহেতু সবার পক্ষেই অনুধাবন করা উচিত যে, এ দুনিয়া দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। সুতরাং এখানে যেসব সম্ভাব্য বিপদ-আপদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে না করলেই ধৈর্যধারণ করা সহজ হতে পারে। পরীক্ষায় সমগ্র উম্মত সমষ্টিগতভাবে উত্তীর্ণ হলে পরে সমষ্টিগতভাবেই পুরস্কার দেয়া হবে; এছাড়াও সবর-এর পরীক্ষায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা যতটুকু উত্তীর্ণ হবেন, তাদের ততটুকু বিশেষ মর্যাদাও প্রদান করা হবে। মূলতঃ মানুষের ঈমান অনুসারেই আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা, বিপদাপদ-বালা মুসিবত নবীদেরকে প্রদান করেন। তারপর যারা তাদের পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক।" [মুসনাদে আহমাদ ৬/৩৬৯]
অর্থাৎ প্রত্যেকের ঈমান অনুসারেই তাদের পরীক্ষা হয়ে থাকে। তবে পরীক্ষা যেন কেউ আল্লাহ্র কাছে কামনা না করে। বরং সর্বদা আল্লাহ্র কাছে নিরাপত্তা কামনা করাই মুমিনের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে বলতে শুনেছেন যে, “হে আল্লাহ্! আমাকে সবরের শক্তি দান কর। তখন তিনি বললেন, তুমি বিপদ কামনা করেছ, সুতরাং তুমি নিরাপত্তা চাও।” [মুসনাদে আহমাদ ৫/২৩১, ২৩৫]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, মুমিনের উচিত নয় নিজেকে অপমানিত করা। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, কিভাবে নিজেকে অপমানিত করে? রাসূল বললেন, এমন কোনো বালা-মুসিবতের সম্মুখীন হয় যা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।” [তিরমিযী ২২৫৪]
যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহ্রই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’[১]।
[১] সবরকারীগণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা বিপদের সম্মুখীন হলে – ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করে। এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, কেউ বিপদে পড়লে যেন এ দোআটি পাঠ করে। কেননা এরূপ বলাতে একাধারে যেমন অসীম সওয়াব পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি যদি এ বাক্যের অর্থের প্রতি যথার্থ লক্ষ্য রেখে তা পাঠ করা হয়, তবে বিপদে আন্তরিক শান্তি লাভ এবং তা থেকে উত্তরণও সহজতর হয়ে যায়। দোআটির অর্থ হচ্ছে, “নিশ্চয় আমরা তো আল্লাহ্রই। আর আমরা তার দিকেই প্রর্তাবর্তন করব।" সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা যদি আমাদের কোনো কষ্ট দেন তবে তাতে কোনো না কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তার উদ্দেশ্যকে সম্মান করতে পারা একটি মহৎ কাজ। আর এটাই হচ্ছে, সবর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুমিনের কর্মকাণ্ড আশ্চর্যজনক। তার সমস্ত কাজই ভাল। মুমিন ছাড়া আর কারও জন্য এমনটি হয় না। যদি তার কোনো খুশীর বিষয় সংঘটিত হয় তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণের হয়। আর যদি তার কোনো ক্ষতিকর কিছু ঘটে যায় তবে সে সবর করে, ফলে তাও তার জন্য কলাণকর হয়।" [মুসলিম ২৯৯৯]
অপর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ বিপদ-মুসিবতে পড়ে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’ বলবে, এবং বলবে, ‘হে আল্লাহ্ আমাকে এ মুসিবত থেকে উদ্ধার করুন এবং এর থেকে উত্তম বস্তু ফিরিয়ে দিন’ অবশ্যই আল্লাহ্ তাকে উত্তম কিছু ফিরিয়ে দিবেন।" [মুসলিম ৯১৮]
এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রবের কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।
কুরআন দুবার বলে, কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
সুতরাং কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে,
নিশ্চয় কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে [১]।
[১] আরবী ভাষার একটি নীতি এই যে, আলিফ ও লামযুক্ত শব্দকে যদি পুনরায় আলিফ ও লাম সহকারে উল্লেখ করা হয়, তবে উভয় জায়গায় একই বস্তুসত্তা অর্থ হয়ে থাকে এবং আলিফ ও লাম ব্যতিরেকে পুনরায় উল্লেখ করা হলে উভয় জায়গায় পৃথক পৃথক বস্তুসত্তা বোঝানো হয়ে থাকে। আলোচ্য আয়াতে العسر শব্দটি যখন পুনরায় العسر উল্লেখ হয়েছে, তখন বোঝা গেল যে, উভয় জায়গায় একই عسر অর্থাৎ কষ্ট বোঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে يسر শব্দটি উভয় জায়গায় আলিফ ও লাম ব্যতিরেকে উল্লেখ হয়েছে। এতে নিয়মানুযায়ী বোঝা যায় যে, দ্বিতীয় يسر তথা স্বস্তি প্ৰথম يسر তথা স্বস্তি থেকে ভিন্ন। অতএব আয়াতে اِنَّ مَعَ الْعُسْرِيُسْرًا এর পুনরুল্লেখ থেকে জানা গেল যে, একই কষ্টের জন্যে দু‘টি স্বস্তির ওয়াদা করা হয়েছে। দু’এর উদ্দেশ্যও এখানে বিশেষ দু’এর সংখ্যা নয়; বরং উদ্দেশ্য অনেক। অতএব, সারকথা এই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কষ্টের সাথে তাকে অনেক স্বস্তি দান করা হবে। হাদীসে এসেছে, “নিশ্চয় বিপদের সাথে মুক্তি আছে, আর নিশ্চয় কষ্টের সাথে আছে স্বস্তি।” [মুসনাদে আহমাদ ১/৩০৭] হাসান বসরী ও কাতাদাহ্ বলেন, ‘এক কষ্ট দুই স্বস্তির উপর প্রবল হতে পারে না।’ [ফাতহুল কাদীর, তাবারী]
আর বলে, মন কোথায় প্রশান্তি পায়: আল্লাহর স্মরণে।
‘যারা ঈমান আনে [১] এবং আল্লাহ্র স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহ্র স্মরণেই মন প্রশান্ত হয় [২];
[১] অর্থাৎ তারা যে নিদর্শন চাচ্ছে তেমনি কোনো নিদর্শন ছাড়াই যারা ঈমান আনে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে।
[২] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার প্রভুর স্মরণ অর্থাৎ যিকির করে আর যে করে না তাদের উদাহরণ হলো জীবিত এবং মৃত ব্যক্তির ন্যায়।” [বুখারী ৬৪০৭]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশতবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পাঠ করবে, তার গুনাহ্ যদি সমুদ্রের ফেনাতুল্যও হয় তবুও আল্লাহ্ দয়া করে তা ক্ষমা করে দিবেন।” [বুখারী ৬৪০৫]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি দিনে একশতবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর’ পড়ে সে ব্যক্তি দশটি দাস স্বাধীন করার সওয়াব পাবে, তার জন্য একশ’টি নেকী লিখা হবে এবং তার একশ’টি গুণাহ্ মিটিয়ে দেয়া হবে। ওই দিন সন্ধা পর্যন্ত শয়তান থেকে তার রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা হবে এবং তার চেয়ে উত্তম আর কেউ হবে না। তবে যে ব্যক্তি এটা তার চেয়ে বেশী পড়ে সে ব্যতীত।” [বুখারী ৬৪০৩]
ইউনুসের ডাক
দু‘আ সংকলন-এ ‘দুশ্চিন্তা ও দুঃখ’ শিরোনামের প্রথম কার্ডে প্রথম দু‘আটি অন্ধকারের ভেতর থেকে ইউনুসের ডাক, কুরআনের ২১:৮৭ আয়াত থেকে: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এই ঘোষণা, তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা, আর নিজের যুলুমের স্বীকারোক্তি। এর সূত্রের লাইনে তিরমিযীর হাদীস উদ্ধৃত আছে, সহীহ মানসহ: কোনো মুসলিম এই দু‘আ দিয়ে যে বিষয়েই দু‘আ করুক, আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন।
ইউনুসের ডাকের আয়াত, আর তার পরের আয়াত, যাতে বলা হয়েছে আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করেছিলেন, আর এভাবেই তিনি মুমিনদের উদ্ধার করেন:
আর স্মরণ করুন, যুন-নূনকে [১], যখন তিনি ক্রোধ ভরে [২] চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে, আমরা তাকে পাকড়াও করব না [৩]। তারপর তিনি অন্ধকারে [৪] এ আহবান করেছিলেন যে, ‘আপনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই; আপনি কতইনা পবিত্র ও মহান, নিশ্চয়ই আমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি’ [৫]।
[১] ইউনুস ইবন মাত্তা আলাইহিস সালামের কাহিনী পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুস, সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা আস-সাফফাত ও সূরা আল-কালামে বিবৃত হয়েছে। কোথাও তার আসল নাম উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও যুননুন এবং কোথাও ছাহেবুল হূত উল্লেখ করা হয়েছে। নূন ও হূত উভয় শব্দের অর্থ মাছ। কাজেই যুননুন ও সাহেবুল হূতের অর্থ মাছওয়ালা। ইউনুস আলাইহিস সালামকে কিছুদিন মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়েছিল এই আশ্চর্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে যুননুন বা ছাহেবুল হূত শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন তাফসীরে এসেছে যে, ইউনুস আলাইহিস সালামকে মুসেলের একটি জনপদ নায়নুয়ার অধিবাসীদের হেদায়াতের জন্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমান ও সৎকর্ম করার দাওয়াত দেন। তারা অবাধ্যতা প্ৰদৰ্শন করে। ইউনুস আলাইহিস সালাম তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আযাবের ভয় দেখিয়ে জনপদ ত্যাগ করেন। এতে তারা ভাবতে থাকে যে এখন আযাব এসেই যাবে। (কোনো কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায় যে আযাবের কিছু কিছু চিহ্নও ফুটে উঠেছিল) তাই অনতিবিলম্বে তারা শির্ক ও কুফর থেকে তওবা করে নেয় এবং জনপদের সব আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তারা চতুষ্পদ জন্তু ও বাচ্চাদেরকেও সাথে নিয়ে যায় এবং বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়। এরপর সবাই কান্নাকাটি শুরু করে এবং কাকুতি-মিনতি সহকারে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে। জন্তুদের বাচ্চারা মাদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়ার কারণে পৃথক শোরগোল করতে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের খাটি তাওবা ও কাকুতি-মিনতি কবুল করে নেন এবং তাদের উপর থেকে আযাব হটিয়ে দেন। এদিকে ইউনুস আলাইহিস সালাম ভাবছিলেন যে, আযাব আসার ফলে তার সম্প্রদায় বোধ হয় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলেন যে, আদৌ আযাব আসেনি এবং তার সম্প্রদায় সুস্থ ও নিরাপদে দিন গুজরান করছে, তখন তিনি চিন্তান্বিত হলেন যে, এখন আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করা হবে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, তার সম্প্রদায়ের মধ্যে কেউ মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে হত্যা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। এর ফলে ইউনুস আলাইহিস সালামের প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিল। তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে ফিরে আসার পরিবর্তে ভিনদেশে হিজরত করার ইচ্ছায় সফর শুরু করলেন। পথিমধ্যে একটি নদী পড়ল। তিনি একটি নৌকায় আরোহন করলেন। ঘটনাক্রমে নৌকা আটকে গিয়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল। মাঝিরা বলল যে, আরোহীদের মধ্যে একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। তাহলে অন্যরা ডুবে মরার কবল থেকে রক্ষা পাবে। এখন কাকে ফেলা হবে, এ নিয়ে আরোহীদের নামে লটারী করা হলে ঘটনাক্রমে এখানে ইউনুস আলাইহিস সালামের নাম বের হল। এই লটারীর কথা উল্লেখ প্রসঙ্গে কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে “লটারীর ব্যবস্থা করা হলে তার (ইউনুস আলাইহিস সালামের) নামই তাতে বের হয়।” [সূরা আস-সাফফাত ১৪১] তখন ইউনুস আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনাবশ্যক কাপড় খুলে নদীতে ঝাপিয়ে পড়লেন। এদিকে আল্লাহ তা'আলা সবুজ সাগরে এক মাছকে আদেশ দিলে সে সাগরের পানি চিরে দ্রুতগতিতে সেখানে পৌছে যায় (ইবন মাসউদের উক্তি) এবং ইউনুস আলাইহিস সালামকে উদরে পুরে নেয়। আল্লাহ তা'আলা মাছকে নির্দেশ দেন যে, ইউনুস আলাইহিস সালামের অস্থি-মাংসের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে তার খাদ্য নয়, বরং তার উদর কয়েকদিনের জন্যে তার কয়েদখানা। [ইবন কাসীর] কুরআনের বক্তব্য ও অন্যান্য বর্ণনা থেকে এতটুকু জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার পরিষ্কার নির্দেশ ছাড়াই ইউনুস আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। তার এই কার্যক্রম আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। ফলে তিনি অসন্তোষের কারণ হন এবং তাকে সমুদ্রে মাছের পেটে অবস্থান করতে হয়।
[২] অর্থাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। বাহ্যতঃ এখানে সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ৰোধ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পালনকর্তার খাতিরে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। কাফের ও পাপাচারীদের প্রতি আল্লাহর খাতিরে রাগাম্বিত হওয়া সাক্ষাত ঈমানের আলামত। [ফাতহুল কাদীর] অন্য অর্থ হচ্ছে, তিনি জাতির উপর রাগ করে চলে গেলেন। [ফাতহুল কাদীর]
[৩] অভিধানের দিক দিয়ে نقدر শব্দের তিন রকম অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রথম, কাবু করা। অর্থাৎ তিনি ধারণা করলেন যে, আমি তাকে কাবু করতে পারব না। বলাবাহুল্য, এরূপ ধারণা কোনো নবী তো দূরের কথা সাধারণ মুসলিমও করতে পারে না। কারণ, এরূপ মনে করা প্রকাশ্য কুফর। [ফাতহুল কাদীর] কাজেই আয়াতে এই অর্থ হওয়া মোটেই সম্ভবপর নয়। দ্বিতীয় অর্থ, সংকীর্ণ করা। যেমন, অন্য আয়াতে রয়েছে:
اللّٰهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَّشَآءُ وَيَقْدِرِْ
“আল্লাহ যার জন্যে জীবিকা প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্যে ইচ্ছা সংকীর্ণ করে দেন।” [সূরা আর-রা'দ ২৬], অনুরূপ আয়াত আরও [দেখুন, সূরা আল-ইসরা ৩০, সূরা আল-কাসাস ৮২, সূরা আল-আনকাবৃত ৬২, সূরা আর-রূম ৩৭, সূরা সাবা ৩৬, সূরা আয-যুমার ৫২, সূরা আশ-শূরা ১২] যেখানে সর্বসম্মতভাবে অর্থ হচ্ছে সংকীর্ণ করা। তখন আয়াতের অর্থ হবে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়কে ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার ব্যাপারে আমার প্রতি কোনোরূপ সংকীর্ণ আচরণ করা হবে না। [ফাতহুল কাদীর] তৃতীয় অর্থ, বিচারে রায় দেয়া। তখন আয়াতের অর্থ হবে এই যে, ইউনুস আলাইহিস সালাম মনে করলেন, এ ব্যাপারে আমার কোনো ত্রুটি ধরা হবে না। তাই আমাকে পাকড়াও করা হবে না। [ইবন কাসীর] মোটকথা, প্রথম অর্থের সম্ভাবনাই নেই, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অর্থ সম্ভবপর।
[৪] অর্থাৎ মাছের পেটের মধ্য থেকে সেখানে তো অন্ধকার ছিলই, তার উপর ছিল সাগরের অন্ধকার ও রাতের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] অথবা মাছের পেটের অন্ধকার, সে মাছের পেট থেকে অপর মাছের পেটের অন্ধকার তার উপর রয়েছে সমুদ্রের অন্ধকার। [ইবন কাসীর] ইবন মাসউদ ও ইবন আব্বাস বলেন, তাকে নিয়ে মাছটি সমুদ্রের গভীরে চলে গেলে সেখানে ইউনুস আলাইহিস সালাম পাথরের তাসবীহ শুনতে পেয়ে তাসবীহ পড়ার কথা স্মরণ করলেন এবং তিনি সেই দোআটি করলেন। [ইবন কাসীর]
[৫] ইউনুস আলাইহিস সালামের দোআ প্রত্যেকের জন্যে, প্রতি যুগের ও প্রতি মকসুদের জন্যে মকবুল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মাছের পেটে পাঠকৃত ইউনুস আলাইহিস সালামের এই দোআটি যদি কোনো মুসলিম কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে পাঠ করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তা কবুল করেন।” [তিরমিযী ৩৫০৫]
তখন আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করেছিলাম, আর এভাবেই আমরা মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি [১]।
[১] অর্থাৎ আমরা যেভাবে ইউনুস আলাইহিস সালামকে দুশ্চিন্তা ও সংকট থেকে উদ্ধার করেছি, তেমনিভাবে সব মুমিনকেও করে থাকি; যদি তারা সততা ও আন্তরিকতার সাথে আমার দিকে মনোনিবেশ করে এবং আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। [দেখুন, ইবন কাসীর]
দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয়
একই কার্ডের পরের অংশের দু‘আয় আটটি বিষয় থেকে, জোড়ায় জোড়ায়, আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে: দুশ্চিন্তা ও দুঃখ, অক্ষমতা ও অলসতা, কাপুরুষতা ও কৃপণতা, ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন। লাইব্রেরি এর সূত্র দিয়েছে বুখারী, মান সহীহ।
সব বিষয় শুধরে দেওয়ার দু‘আ
একই শিরোনামের দ্বিতীয় কার্ডে একটিই দু‘আ: আল্লাহকে চিরঞ্জীব ও সর্বসংরক্ষক বলে ডাকা, তাঁর রহমতের উসিলায় সাহায্য চাওয়া, সব বিষয় শুধরে দেওয়ার প্রার্থনা, আর এক পলকের জন্যও নিজের হাতে ছেড়ে না দেওয়ার মিনতি। লাইব্রেরি এর সূত্র দিয়েছে নাসাঈর ‘আমালুল ইয়াওমি ওয়াল-লাইলাহ’ গ্রন্থ, মান হাসান।
দু‘আটির নিচে ‘একটি কথা’ নামে লাইব্রেরির নিজের একটি টীকা আছে: দুঃখ যখন কথা কেড়ে নেয়, তখন এই দু‘আগুলোই কথা হয়ে যায়; আর মুখস্থ না থাকলে পড়ে নেওয়া যায়, কারণ পড়াও দু‘আ।
যেকোনো বিপদে
পকেট সঙ্গী-র ‘বিপদ ও দুশ্চিন্তা’ কার্ডের প্রথম দু‘আটির লেবেল ইংরেজিতে লেখা, যার অর্থ ‘যেকোনো বিপদে’। এতে আল্লাহর প্রশংসা করা হয় মহান ও সহনশীল বলে, মহান আরশের এবং আসমান ও জমিনের রব বলে। সূত্রের লাইনে একে বলা হয়েছে বিপদের দু‘আ; সূত্র বুখারী ও মুসলিম, মান সহীহ।
ওই কার্ডের পরের অংশে ওপরের দুটি দু‘আ, আশ্রয় চাওয়ার দু‘আ ও ইউনুসের দু‘আ, আবার দেওয়া আছে। ইউনুসের দু‘আর আরবি একই। আশ্রয় চাওয়ার দু‘আয় কৃপণতা ও কাপুরুষতার শব্দ দুটি পকেট সঙ্গীতে আছে দু‘আ সংকলনের উল্টো ক্রমে, আর অর্থ দেওয়া হয়েছে সংক্ষিপ্ত তালিকা হিসেবে। লাইব্রেরি দুই জায়গাতেই সূত্র দিয়েছে বুখারী; এই পাতা দুটির মধ্যে কোনোটিকে বেছে নেয় না।
শোক যখন কারও মৃত্যুতে
পকেট সঙ্গীতে ‘শোক ও মৃত্যু’ শিরোনামে একটি কার্ড আছে, স্থানীয় সংস্করণে দুই অংশে ছাপা: প্রথম অংশে কারও মৃত্যুর খবর শুনে যা বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ; দ্বিতীয় অংশে শোকার্তকে সান্ত্বনা দেওয়ার কথা এবং কবরের কাছে সালাম। এর একটি পাঠ, মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ, নিয়ে লাইব্রেরির নিজস্ব যাচাইয়ে প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয়নি (পুরো পাঠ কীভাবে ছাপা হবে, আর তার অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে), তাই কার্ডটি এখানে উদ্ধৃত হলো না। লাইব্রেরিতে যেভাবে আছে সেভাবে পড়তে কার্ডটির প্রথম অংশ ও দ্বিতীয় অংশ দেখুন। বিপদের সময়ের যে কথা উপরে ২:১৫৬ আয়াতে আছে, তা কুরআনের নিজের কথা।
সূত্র
কুরআনের আয়াত, সূরা ও আয়াত নম্বরে, উপরে দেখানো: ২:১৫৫–১৫৭; ১৩:২৮; ২১:৮৭–৮৮; ৯৪:৫–৬।
হাদীস, গ্রন্থ ও নম্বরে, sunnah.com যেভাবে নম্বর দেয়: বুখারী ফাতহুল বারীর নম্বর অনুযায়ী; মুসলিম মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকীর নম্বর অনুযায়ী, আর sunnah.com যেখানে একটি নম্বরকে ভাগ করেছে সেখানে তার বর্ণ (ক = a, খ = b) সহ; তিরমিযী sunnah.com-এর জামি‘ তিরমিযীর নম্বর অনুযায়ী। লাইব্রেরি প্রতিটি দু‘আর নিচে গ্রন্থের নাম দিয়েছে; নম্বরটি সেই হাদীসের।
- ইউনুসের দু‘আ, আর তাতে সাড়া দেওয়ার কথা: জামি‘ তিরমিযী ৩৫০৫।
- দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয়: সহীহ বুখারী ৬৩৬৯; পকেট সঙ্গীর শব্দক্রমে সহীহ বুখারী ৬৩৬৩।
- বিপদের দু‘আ: সহীহ বুখারী ৬৩৪৬; সহীহ মুসলিম ২৭৩০ক।
- আল্লাহকে চিরঞ্জীব ও সর্বসংরক্ষক বলে ডাকার দু‘আ: নাসাঈর ‘আমালুল ইয়াওমি ওয়াল-লাইলাহ’, লাইব্রেরি যেভাবে সূত্র দিয়েছে। গ্রন্থটি sunnah.com-এ নেই, তাই এখানে নম্বর দেওয়া হলো না।
সাবীল লাইব্রেরি থেকে: দু‘আ সংকলন, ‘দুশ্চিন্তা ও দুঃখ’-এর দুটি কার্ড; পকেট সঙ্গী, ‘বিপদ ও দুশ্চিন্তা’ কার্ড, আর ‘শোক ও মৃত্যু’ কার্ড, লিংক হিসেবে, উদ্ধৃত নয়।
এরপর কোথায় যাবেন
- প্রয়োজন অনুযায়ী দু‘আ পাতায় দু‘আ সংকলনের বাকি দু‘আগুলো আছে, প্রয়োজন ধরে সাজানো।
- দু‘আ সংকলন ও পকেট সঙ্গী কার্ড হিসেবে প্রিন্ট করে সঙ্গে রাখা যায়।
- লাইব্রেরির জানাযা শিরোনামে আছে শেষ শ্বাস থেকে কবর ভরাট পর্যন্ত ধারাবাহিক করণীয়।
সাবীলের মেইলবক্স তৈরি করা হচ্ছে। কেউ তা পড়া শুরু করলেই এই প্রবন্ধে সংশোধন বা মতামত পাঠানোর উপায় দেওয়া হবে।