ঘুমের আগের যিকির ও দু‘আ
ঘুমের আগে সাবীল লাইব্রেরির ক্রম: ওযু, আয়াতুল কুরসি, তিন সূরা, বাকারার শেষ দুই আয়াত, দুটি দু‘আ ও খারাপ স্বপ্ন, সূত্রসহ।
এআই-এর লেখা · আলেমদের পর্যালোচনা বাকি আছে
এই প্রবন্ধের কথাগুলো সাবীল লাইব্রেরি ও তার উৎসগুলো থেকে এআই লিখেছে, এবং এআই-ই সেগুলোর সাথে মিলিয়ে তা যাচাই করেছে। কোনো আলেম এখনও এটি পর্যালোচনা করেননি। আরবি পাঠ, সেগুলোর অর্থ ও সেগুলোর সূত্র লাইব্রেরি ও কুরআনের নিজস্ব, সেখানে যেমন আছে হুবহু তেমনই দেখানো। নিজের অবস্থার ব্যাপারে ফতোয়ার জন্য একজন যোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
প্রকাশিত ৩ অক্টোবর, ২০২৬হালনাগাদ ২১ অক্টোবর, ২০২৬পড়তে ১২ মিনিট
হাদীসে দিনের শেষটারও একটি নিজস্ব রূপ আছে: ওযু, কুরআনের কয়েকটি অংশ, গুনে গুনে তাসবীহ, ডান কাতে শোয়া, আর ঘুমের আগের শেষ কথা হিসেবে একটি দু‘আ। এই পাতায় সাবীল লাইব্রেরি এই ক্রম যেভাবে ছেপেছে সেভাবে তা সাজানো হয়েছে, প্রতিটি ধাপ কোথা থেকে এসেছে তা বলা হয়েছে, আর খারাপ স্বপ্ন নিয়ে লাইব্রেরির কার্ডগুলো যা বলে তা যোগ করা হয়েছে। প্রতিটি অংশ লাইব্রেরি থেকে দেখানো হয়েছে: আরবি পাঠ, উচ্চারণ, কার্ডে যেখানে আছে সেখানে অর্থ, আর লাইব্রেরির দেওয়া সূত্র ও মান; যেসব হাদীস থেকে এগুলো এসেছে, শেষে সেগুলোর নম্বর দেওয়া আছে। কিছু আয়াতের নিচে সংস্করণের নিজের টীকাও দেখানো হয়; সেগুলো সংস্করণের নিজের কথা, এই পাতার নয়।
কুরআনে ঘুম
কুরআন ঘুমকে প্রাণ হরণের মতো করে বর্ণনা করে: আল্লাহই মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণ করেন, আর যাদের মৃত্যু আসেনি তাদের প্রাণও নিদ্রার সময়; তারপর যার জন্য মৃত্যুর সিদ্ধান্ত করেন তার প্রাণ রেখে দেন, আর অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।
আল্লাহ্ই জীবসমূহের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু আসেনি তাদের প্রাণও নিদ্রার সময়। তারপর তিনি যার জন্য মৃত্যুর সিদ্ধান্ত করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য [১]। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।
[১] توفى এর শাব্দিক অর্থ লওয়া ও করায়ত্ত করা। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, প্রাণীদের প্রাণ সর্বাবস্থায় ও সর্বক্ষণই আল্লাহ্ তা'আলার আয়ত্ত্বাধীন। তিনি যখন ইচ্ছা তা হরণ করতে বা ফিরিয়ে নিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলার এ কুদরত প্রত্যেক প্রাণীই প্রত্যহ দেখে ও অনুভব করে। নিদ্রার সময় তার প্রাণ আল্লাহ তা'আলার করায়ত্তে চলে যায় এবং ফিরিয়ে দেয়ার পর জাগ্রত হয়। অবশেষে এমন এক সময় আসবে, যখন তা সম্পূর্ণ করায়ত্ত হয়ে যাবে এবং ফিরে পাওয়া যাবে না। প্রাণ হরণ করা অর্থ তার সম্পর্ক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। কখনও বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সবদিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, এরই নাম মৃত্যু। আবার কখনও শুধু বাহিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়। আভ্যন্তরীণভাবে যোগাযোগ থাকে। এর ফলে কেবল বাহ্যিকভাবে জীবনের লক্ষণ, চেতনা ও ইচ্ছাভিত্তিক নড়াচড়ার শক্তি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় এবং আভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে দেহের সাথে প্ৰাণের সম্পর্ক বাকী থাকে। ফলে সে শ্বাস গ্রহণ করে ও জীবিত থাকে। আলোচ্য আয়াতে توفى শব্দটি উপরোক্ত উভয় প্রকার প্রাণ হরণের অর্থকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে প্রথমে বড় মৃত্যুর কথা পরে ছোট মৃত্যু বা ঘুমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্রও দু'ধরনের মৃত্যুর উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُم بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَىٰ أَجَلٌ مُّسَمًّى ۖ ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
“তিনিই রাতে তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং দিনে তোমরা যা কর তা তিনি জানেন। তারপর দিনে তোমাদেরকে তিনি আবার জীবিত করেন যাতে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়। তারপর তাঁর দিকেই তোমাদের ফিরে যাওয়া। তারপর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।" [সূরা আল-আন’আম ৬০] এখানে প্রথমে ছোট মৃত্যু বা ঘুমের কথা, পরে বড় মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
মোটকথা, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষকে এ অনুভূতি দিতে চাচ্ছেন যে, জীবন ও মৃত্যু কিভাবে তাঁর অসীম ক্ষমতার করায়ত্ব। শয়নে, জাগরণে, ঘরে অবস্থানের সময় কিংবা কোথাও চলাফেরা করার সময় মানব দেহের আভ্যন্তরীণ কোনো ক্ৰটি অথবা বাইরের অজানা কোনো বিপদ অকস্মাৎ এমন মোড় নিতে পারে যা তার মৃত্যু ঘটাতে পারে। যে মানুষ আল্লাহর হাতে এতটা অসহায় সে যদি সেই আল্লাহ সম্পর্কে এতটা অমনোযোগী ও বিদ্রোহী হয় তাহলে সে কত অজ্ঞ। সে জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর আগে এবং ঘুম থেকে উঠে যে দো'আ করতেন তাতে রূহ ফেরত পাওয়ায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। হাদীসে এসেছে, তিনি ঘুমাবার সময় বলতেন:
بِاسْمِكَ اللّٰهُمَّ أَمُوْتُ وَ أَخْيَا
“হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মারা যাই এবং জীবিত হই।” আর যখন ঘুম থেকে জাগতেন তখন বলতেন:
الْحَمْدُللّٰهِ الَّذِيْ أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُوْرُ
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে আমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করেছেন। আর তাঁর কাছেই আমরা উত্থিত হবো।” [বুখারী ৬৩১২]
নিচের ছোট দু‘আটিও একই কথায় বলা: আল্লাহর নামেই বান্দা মরে ও বাঁচে।
ঘুমের সময়ের কার্ড: ক্রম অনুযায়ী
পকেট সঙ্গী-র “দৈনিক সঙ্গী” সেটে “ঘুমের সময় ও রাত” শিরোনামের একটি কার্ড আছে; স্থানীয় সংস্করণে এটি দুই ভাগে ছাপা। প্রথম ভাগ শুরু হয়েছে ঘুমের আগের পুরো ক্রম দিয়ে:
- ওযু;
- আয়াতুল কুরসি, একবার;
- ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ, তিনবার;
- আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত;
- সূরা আল-মুলক;
- তাসবীহ, ৩৩, ৩৩ ও ৩৪ বার;
- তারপর ডান কাতে শোয়া।
এই লাইনের সূত্র হিসেবে লাইব্রেরি বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীর নাম দিয়েছে, মান সহীহ। এই গ্রন্থগুলোর হাদীসে এর ধাপগুলোর কথা আছে। বারা ইবনে আযিব বর্ণনা করেন, নবী ﷺ তাঁকে বলেছিলেন, বিছানায় যাওয়ার সময় নামাযের মতো ওযু করতে এবং ডান কাতে শুতে। আয়েশা বর্ণনা করেন, নবী ﷺ প্রতি রাতে বিছানায় গিয়ে দুই হাত একত্র করে ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে তাতে ফুঁ দিতেন, তারপর শরীরের যতটুকু পারতেন মাসেহ করতেন, তিনবার। বুখারী পূর্ণ সনদ ছাড়া একটি বর্ণনা এনেছেন, যাতে আবু হুরায়রা বলেন, তাঁকে বলা হয়েছিল: বিছানায় যাওয়ার সময় যে আয়াতুল কুরসি পড়ে, সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সাথে একজন রক্ষক থাকে, আর কোনো শয়তান তার কাছে আসে না; আর নবী ﷺ বলেছিলেন, যে তাঁকে এ কথা বলেছিল, সে সত্য বলেছে। আবু মাসউদ বর্ণনা করেন, রাতে আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া মানুষের জন্য যথেষ্ট। আর আলী বর্ণনা করেন, ফাতিমা একজন খাদেম চাইলে নবী ﷺ তার বদলে তাঁদের দুজনকে শিখিয়ে দেন, বিছানায় যাওয়ার সময় তাসবীহ, তাহমীদ ও তাকবীর বলতে, ৩৩, ৩৩ ও ৩৪ বার।
এরপর আছে একটি ছোট দু‘আ: হুযায়ফা বর্ণনা করেন, নবী ﷺ বিছানায় যাওয়ার সময় এটি বলতেন। লাইব্রেরি এর সূত্র দিয়েছে বুখারী, মান সহীহ।
ঘুমের আগের শেষ কথা
কার্ডের দ্বিতীয় ভাগে আছে আরেকটু দীর্ঘ একটি দু‘আ, যা বারাকে শেখানো হয়েছিল: বান্দা নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে, মুখ তাঁর দিকে ফেরায়, নিজের কাজ তাঁকে সোপর্দ করে, আর পিঠ তাঁর উপর ন্যস্ত করে। লাইব্রেরি এর সূত্রও দিয়েছে বুখারী, মান সহীহ। সূত্রের লাইনটি কার্ডে ইংরেজিতে ছাপা; তাতে একে বলা হয়েছে ঘুমের আগের শেষ কথা, আর যোগ করা হয়েছে: যে সেই রাতে মারা যায়, সে ফিতরাতের উপর মারা যায়। হাদীসে নবী ﷺ বারাকে বলেন, এগুলোকেই যেন তিনি নিজের শেষ কথা বানান।
কার্ডে দু‘আটির কেবল শুরুর অংশ ছাপা আছে। পর্দায় অ্যাপ এটি পুরো দেখায়, বুখারীর একটি বর্ণনা থেকে নিয়ে (কার্ড সূত্র হিসেবে বুখারীর নামই দিয়েছে), আর নিচের একটি লাইনে তা জানিয়ে দেয়। পুরো পাঠের সাথে যে অর্থ দেখানো হয়, তা একটি উন্মুক্ত হাদীস ডেটাসেটে থাকা ওই বর্ণনার অনুবাদ; অ্যাপ সেখানেই জানিয়ে দেয় যে এটি কেউ আরবির সাথে মিলিয়ে দেখেনি। বাংলা অনুবাদটি শুরু হয়েছে হাদীসের আগের অধ্যায়-শিরোনাম দিয়ে। কার্ডের নিজের অর্থ সংক্ষিপ্ত পাঠের জন্য লেখা; সেটিও নিচে থাকে।
কার্ডের শেষে খারাপ স্বপ্নের জন্য একটি লাইন আছে, সূত্র মুসলিম, মান সহীহ: বাম দিকে তিনবার হালকা থুথু ফেলা, শয়তান ও যা দেখেছেন তা থেকে আশ্রয় চাওয়া, অন্য কাতে ফেরা, এবং কাউকে না বলা।
قَالَ مُجَاهِدٌ يَتَنَزَّلُ الأَمْرُ بَيْنَهُنَّ بَيْنَ السَّمَاءِ السَّابِعَةِ وَالأَرْضِ السَّابِعَةِ মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, ‘ওদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর হুকুম’- (সূরাহ আত্ ত্বলাক (তালাক) ৬৫/১২)। সপ্তম আকাশ ও সপ্তম যমীনের মাঝখানে। ৭৪৮৮. বারাআ ইবনু ‘আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছেনঃ হে অমুক! যখন তুমি তোমার বিছানায় যাবে তখন বলবে, হে আল্লাহ্! আমি আমার নিজেকে তোমারই কাছে সোপর্দ করছি। আমার চেহারাকে তোমার দিকে ফিরাচ্ছি! আমার কর্ম তোমার কাছে সোপর্দ করছি। আমার নির্ভরতা তোমারই প্রতি আশা ও ভয় উভয় হালাতেই। তোমার নিকট ব্যতীত আর কোথাও আশ্রয় ও মুক্তির জায়গা নেই। আমি ঈমান এনেছি তোমার কিতাবের প্রতি যা তুমি নাযিল করেছ এবং তোমার নবীর প্রতি যাঁকে তুমি পাঠিয়েছ। অতঃপর এ রাতে যদি তোমার মওত হয়, তাহলে ফিত্রাতের ওপর তোমার মওত হবে। আর যদি (জীবিত থেকে) তোমার ভোর হয়, তুমি প্রতিদান পাবে। [২৪৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
Narrated Al-Bara' bin `Azib:Allah's Messenger (ﷺ) said, "O so-and-so, whenever you go to your bed (for sleeping) say, 'O Allah! I have surrendered myself over to you and have turned my face towards You, and leave all my affairs to You and depend on You and put my trust in You expecting Your reward and fearing Your punishment. There is neither fleeing from You nor refuge but with You. I believe in the Book (Qur'an) which You have revealed and in Your Prophet (Muhammad) whom You have sent.' If you then die on that night, then you will die as a Muslim, and if you wake alive in the morning then you will receive the reward." (See Hadith No. 323, Vol)
অনুবাদটি উন্মুক্ত ডেটাসেটের নিজস্ব, যেমন আছে তেমনই দেখানো হয়েছে: অনুবাদকের নাম নেই, এর স্বত্ব যাচাই করা হয়নি, এবং কেউ এটি আরবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেনি।
পুরো পাঠ দেখানো হয়েছে, সহীহ আল-বুখারী · নং ৭৪৮৮ থেকে। ছাপা সংস্করণে এটি সংক্ষেপে আছে। নিচের লাইনগুলো ছাপা সংস্করণের, যা সংক্ষিপ্ত পাঠের জন্য লেখা।
বিন্দু-রেখার পাশের লাইনগুলো আরবির উচ্চারণ, হরকত দেখে নিয়ম অনুযায়ী তৈরি। এগুলো ছাপা সংস্করণের নয় এবং কেউ যাচাই করেননি: কোথাও আরবির সঙ্গে না মিললে আরবিটিই সঠিক।
আদব ও আখলাকের কার্ড: ঘুম
লাইব্রেরির আদবের কার্ডগুলোর একটি ঘুম নিয়ে, আর তা ওপরের ক্রমের সাথে কয়েকটি কথা যোগ করে: শোয়ার আগে বিছানা তিনবার ঝেড়ে নেওয়া; ডান কাতে, গালের নিচে হাত রেখে শোয়া; আর উপুড় হয়ে না শোয়া, যাকে কার্ডে বলা হয়েছে আল্লাহর অপছন্দের ভঙ্গি। একই তিলাওয়াতের কথাও আছে: আয়াতুল কুরসি, আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত, আর তিন কুল পড়ে হাতে ফুঁ দেওয়া। এই লাইনগুলোর সূত্র হিসেবে লাইব্রেরি বুখারী ও মুসলিমের, এবং আবু দাউদ ও তিরমিযীর নাম দিয়েছে; মান সহীহ। স্থানীয় সংস্করণে এই কার্ডও দুই ভাগে ছাপা। প্রথম ভাগের শেষে “দিনের শেষ কথা” লেবেলের নিচে (লেবেলটি কার্ডে ইংরেজিতে ছাপা) সেই ছোট দু‘আটিই আবার এসেছে।
দ্বিতীয় ভাগের শুরুতে দু‘আটির উচ্চারণ আবার এসেছে, তারপর এর সূত্র: বুখারী, মান সহীহ। এই ভাগেই আছে ঘুম থেকে ওঠার দু‘আ, সূত্র বুখারী। শেষ লাইনটি স্বপ্ন নিয়ে, সূত্র বুখারী ও মুসলিম, মান সহীহ: খারাপ স্বপ্নের বেলায় ঘুমের কার্ডের মতোই করণীয়, আর সাথে ভালো স্বপ্ন নিয়ে একটি বাক্য। বুখারীতে আবু কাতাদা নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে দেখে সে তা শুধু তাকেই বলবে যাকে সে ভালোবাসে; আর অপছন্দের স্বপ্ন দেখলে তার অনিষ্ট ও শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইবে, তিনবার থুথু ফেলবে, আর কাউকে বলবে না।
আয়াতুল কুরসি
দুই কার্ডেই আয়াতুল কুরসির নাম আছে, কিন্তু আয়াতটি ছাপা নেই। পকেট সঙ্গীর “পকেট আযকার” সেটে এর নিজস্ব একটি কার্ড আছে, কুরআন ২:২৫৫ হিসেবে। কার্ডের লেবেল ও সূত্রের লাইন ইংরেজিতে ছাপা। লেবেলে আছে: প্রতি ফরযের পর একবার। সূত্রের লাইনে আছে নাসাঈ ও তাবারানীর নাম, মান সহীহ; আর লাইনটি শেষ হয়েছে এই কথায়: ঘুমের আগেও।
আয়াতের শেষ ও ওয়াক্ফের চিহ্ন মুসহাফ অনুযায়ী দেখানো হয়েছে, কুরআন ২:২৫৫ থেকে। ছাপা সংস্করণে এই অংশে এগুলো নেই।
বিন্দু-রেখার পাশের লাইনগুলো আরবির উচ্চারণ, হরকত দেখে নিয়ম অনুযায়ী তৈরি। এগুলো ছাপা সংস্করণের নয় এবং কেউ যাচাই করেননি: কোথাও আরবির সঙ্গে না মিললে আরবিটিই সঠিক।
কার্ডে আয়াতটির অর্থ ছাপা নেই। অর্থসহ আয়াতটি:
আল্লাহ্ [১], তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই [২]। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক [৩]। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয় [৪]। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর [৫]। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে [৬]? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন [৭]। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না [৮]। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে [৯]; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না [১০]। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান। [১১]
[১] এ আয়াতটিকে আয়াতুল কুরসী বলা হয়। এটি মর্যাদার দিক থেকে কুরআনের সর্ববৃহৎ আয়াত। হাদীসে এ আয়াতের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবন কাবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কুরআনের মধ্যে কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ? উবাই ইবন কা'ব আরয করলেন, তা হচ্ছে আয়াতুল কুরসী। রাসূল সাল্লাল্লাহু '‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা সমর্থন করে বললেন, হে আবুল মুনযির! জ্ঞান তোমার জন্য সহজ হোক। [মুসলিম ৮১০]
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে লোক প্রত্যেক ফরয সালাতের পর আয়াতুল-কুরসী নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো অন্তরায় থাকে না’। [নাসায়ী, দিন-রাতের আমল ১০০]
অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথেই সে জান্নাতের ফলাফল এবং আরাম আয়েশ উপভোগ করতে শুরু করবে। অনেকেই এ সূরার আয়াতুল কুরসীতে “ইসমে আযম” আছে বলে মত দিয়েছেন।
আয়াতুল কুরসীর বিশেষ তাৎপর্য: এ আয়াতে মহান রব আল্লাহ্ জাল্লা-শানুহুর একক অস্তিত্ব, তাওহীদ ও গুণাবলীর বর্ণনা এক অত্যাশ্চর্য ও অনুপম ভঙ্গিতে দেয়া হয়েছে, যাতে আল্লাহ্র অস্তিত্ববান হওয়া, জীবিত হওয়া, শ্রবণকারী হওয়া, দর্শক হওয়া, বাকশক্তিসম্পন্ন হওয়া, তাঁর সত্তার অপরিহার্যতা, তাঁর অসীম-অনন্তকাল পর্যন্ত থাকা, সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা ও উদ্ভাবক হওয়া, যাবতীয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া, সমগ্র বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া, এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী হওয়া যাতে তাঁর অনুমতি ছাড়া তার সামনে কেউ কোনো কথা বলতে না পারে, এমন পরিপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যাতে সমগ্র বিশ্ব ও তার যাবতীয় বস্তুনিচয়কে সৃষ্টি করা এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের শৃংখলা বজায় রাখতে গিয়ে তাঁকে কোনো ক্লান্তি বা পরিশ্রান্তির সম্মুখীন হতে হয় না এবং এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যাতে কোনো প্রকাশ্য কিংবা গোপন বস্তু কিংবা কোনো অণু-পরমাণুর বিন্দু-বিসর্গও যাতে বাদ পড়তে না পারে। এই হচ্ছে আয়াতটির মোটামুটি ও সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু। আল্লামা ইবন কাসীর বলেন, এ আয়াতটিতে দশটি বাক্য রয়েছে। প্রতিটি বাক্যের সাথেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা রয়েছে।
[২] প্রথম বাক্য (اَللّٰهُ لَآ اِلٰهَ اِلَّا ھُوَ) এতে ‘আল্লাহ্' শব্দটি অস্তিত্ববাচক নাম। (لَآ اِلٰهَ اِلَّا ھُوَ) সে সত্তারই বর্ণনা, যে সত্তা ‘ইবাদাতের যোগ্য। মহান আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো সত্তা-ই ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য নয়। তিনিই একমাত্র হক মা’বুদ। আর সবই বাতিল উপাস্য।
[৩] দ্বিতীয় বাক্য (اَلْـحَيُّ الْقَيُّوْمُ) আরবী ভাষায় (اَلْـحَيُّ) অর্থ হচ্ছে জীবিত আল্লাহ্র নামের মধ্য থেকে এ নামটি ব্যবহার করে বলে দিয়েছে যে, তিনি সর্বদা জীবিত; মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে না। (قَيُّوْمُ) শব্দ কিয়াম থেকে উৎপন্ন, এটা ব্যুৎপত্তিগত আধিক্যের অর্থে ব্যবহৃত। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তিনি নিজে বিদ্যমান থেকে অন্যকেও বিদ্যমান রাখেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন। ‘কাইয়ূম’ আল্লাহ্র এমন এক বিশেষ গুণবাচক নাম যাতে কোনো সৃষ্টি অংশীদার হতে পারে না। তাঁর সত্তা স্থায়ীত্বের জন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। কেননা যে নিজের স্থায়ীত্ব ও অস্তিত্বের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী, সে অন্যের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কী করে করবে? সে জন্যই কোনো মানুষকে 'কাইয়ূম’ বলা জায়েয নয়। যারা ‘আবদুল কাইয়ূম’ নামকে বিকৃত করে শুধু কাইয়ূম’ বলে, তারা গোনাহগার হবে। অনুরূপভাবে, আল্লাহ্র এমন আরও কিছু নাম আছে, যেগুলো কোনো বান্দাহর বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না। যেমন রাহমান, মান্নান, দাইয়্যান, ওয়াহহাব এ জাতীয় নামের ব্যাপারেও উপরোক্ত হুকুম প্রযোজ্য। আল্লাহ্র নামের মধ্যে (اَلْـحَيُّ الْقَيُّوْمُ) অনেকের মতে ‘ইসমে-আযম’।
[৪] তৃতীয় বাক্য (لَا تَاْخُذُهٗ سِـنَةٌ وَّلَا نَوْمٌ) আরবীতে (سِـنَةٌ) শব্দের সীন-এর (كَسرة) দ্বারা উচ্চারণ করলে এর অর্থ হয় তন্দ্রা বা নিদ্রার প্রাথমিক প্রভাব (نَوْمٌ) পূর্ণ নিদ্রাকে বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। পূর্ববর্তী বাক্যে 'কাইইয়্যুম’ শব্দে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আসমান ও যমীনের যাবতীয় বস্তুর নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছেন আল্লাহ্ তা'আলা। সমস্ত সৃষ্টিরাজি তাঁর আশ্রয়েই বিদ্যমান। এতে করে হয়ত ধারণা হতে পারে যে, যে সত্তা এত বড় কার্য পরিচালনা করেছেন, তাঁর কোনো সময় ক্লান্তি আসতে পারে এবং কিছু সময় বিশ্রাম ও নিদ্রার জন্য থাকা দরকার। দ্বিতীয় বাক্য দ্বারা সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহ্কে নিজের বা অন্য কোনো সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করবে না, নিজের মত মনে করবে না। তিনি সমকক্ষতা ও সকল তুলনার উর্ধ্বে। তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতার পক্ষে এসব কাজ করা কঠিন নয়। আবার তাঁর ক্লান্তিরও কোনো কারণ নেই। আর তাঁর সত্তা যাবতীয় ক্লান্তি, তন্দ্রা ও নিদ্রার প্রভাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
[৫] চতুর্থ বাক্য
(لَهٗ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ)
বাক্যের প্রারম্ভে ব্যবহৃত (لام) অক্ষর মালিকানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আকাশ এবং যমীনে যা কিছু রয়েছে সে সবই আল্লাহ্র মালিকানাধীন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তির মালিক। যেভাবে ইচ্ছা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
[৬] পঞ্চম বাক্য
(مَنْ ذَا الَّذِيْ يَشْفَعُ عِنْدَهٗٓ اِلَّا بِاِذْنِهٖ)
অর্থ হচ্ছে, এমন কে আছে যে, তাঁর সামনে কারো সুপারিশ করতে পারে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত? এতে বুঝা যায় যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা যাবতীয় সৃষ্ট বস্তুর মালিক এবং কোনো বস্তু তাঁর চেয়ে বড় নয়, তাই কেউ তাঁর কোনো কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকারী নয়। তিনি যা কিছু করেন, তাতে কারো আপত্তি করার অধিকার নেই। তবে এমন হতে পারত যে, কেউ কারো জন্য সুপারিশ করে, তাই এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, এ ক্ষমতাও কারো নেই। তবে আল্লাহ্র কিছু খাস বান্দা আছেন, যারা তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে তা করতে পারবেন, অন্যথায় নয়। হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম আমি সুপারিশ করব।’ [মুসলিম ১৯৩]
একে ‘মাকামে-মাহমুদ’ বলা হয়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস। অন্য কারো জন্য নয়।
[৭] ষষ্ঠ বাক্য
(يَعْلَمُ مَا بَيْنَ اَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَھُمْ)
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা অগ্র-পশ্চাত যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা সম্পর্কে অবগত। অগ্র-পশ্চাত বলতে এ অর্থও হতে পারে যে, তাদের জন্মের পূর্বের ও জন্মের পরের যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনাবলী আল্লাহ্র জানা রয়েছে। আর এ অর্থও হতে পারে যে, অগ্র বলতে সে অবস্থা বোঝানো হয়েছে যা মানুষের জন্য প্রকাশ্য, আর পশ্চাত বলতে বোঝানো হয়েছে যা অপ্রকাশ্য। তাতে অর্থ হবে এই যে, কোনো কোনো বিষয় মানুষের জ্ঞানের আওতায় রয়েছে কিন্তু কোনো কোনো বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই। কিছু তাদের সামনে প্রকাশ্য আর কিছু গোপন। কিন্তু আল্লাহ্র ক্ষেত্রে সবই প্রকাশ্য। তাঁর জ্ঞান সে সমস্ত বিষয়ের উপরই পরিব্যপ্ত। সুতরাং এ দু'টিতে কোনো বিরোধ নেই। আয়াতের ব্যাপকতায় উভয়দিকই বোঝানো হয়।
[৮] সপ্তম বাক্য
(وَلَا يُحِيْطُوْنَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهٖٓ اِلَّا بِمَا شَاءَ)
অর্থাৎ মানুষ ও সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান আল্লাহ্র জ্ঞানের কোনো একটি অংশবিশেষকেও পরিবেষ্টিত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা যাকে যে পরিমাণ জ্ঞান দান করেন শুধু ততটুকুই সে পেতে পারে। এতে বলা হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টির অণু-পরমাণুর ব্যাপক জ্ঞান আল্লাহ্র জ্ঞানের আওতাভুক্ত, এটা তাঁর বৈশিষ্ট্য। মানুষ অথবা অন্য কোনো সৃষ্টি এতে অংশীদার নয়।
[৯] অষ্টম বাক্য
(وَسِعَ كُرْسِـيُّهُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ)
অর্থাৎ তাঁর কুরসী এত বড় যার মধ্যে সাত আকাশ ও যমীন পরিবেষ্টিত রয়েছে। হাদীসের বর্ণনা দ্বারা এতটুকু বোঝা যায় যে, আরশ ও কুরসী এত বড় যে, তা সমগ্র আকাশ ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। ইবন কাসীর আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, কুরসী কী এবং কেমন? তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কছম, কুরসীর সাথে সাত আসমানের তুলনা একটি বিরাট ময়দানে ফেলে দেয়া একটি আংটির মত। আর কুরসীর উপর আরশের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন আংটির বিপরীতে বিরাট ময়দানের শ্রেষ্ঠত্ব’। [ইবন হিব্বান ৩৬১, বায়হাকী ৪০৫]
[১০] নবম বাক্য
(وَلَا يَـــــئُـــوْدُهٗ حِفْظُهُمَا)
"অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষে এ দুটি বৃহৎ সৃষ্টি, আসমান ও যমীনের হেফাজত করা কোনো কঠিন কাজ বলে মনে হয় না। কারণ এই অসাধারণ ও একক পরিপূর্ণ সত্তার পক্ষে এ কাজটি একান্তই সহজ ও অনায়াসসাধ্য।
[১১] দশম বাক্য (وَھُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ) অর্থাৎ তিনি অতি উচ্চ ও অতি মহান। পূর্বের নয়টি বাক্যে আল্লাহ্র সত্তা ও গুণের পূর্ণতা বর্ণনা করা হয়েছে। তা দেখার এবং বোঝার পর প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলতে বাধ্য হবে যে, সকল শান-শওকত, বড়ত্ব ও মহত্ব এবং শক্তির একমাত্র মালিক আল্লাহ্ তা'আলা। এ দশটি বাক্যে আল্লাহ্র যাত ও সিফাতের পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
আর আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত, যার নাম দুই কার্ডেই আছে:
রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্র উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্তাবর্তনস্থল।
আল্লাহ্ কারও উপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত [১]। সে ভাল যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই, আর মন্দ যা কামাই করে তার প্রতিফল তার উপরই বর্তায়। ‘হে আমাদের রব! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের উপর তেমন বোঝা চাপিয়ে দিবেন না। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বহন করাবেন না যার সামর্থ আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের পাপ মোচন করুন, আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদের প্রতি দয়া করুন, আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব, কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন [২]।’
[১] পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছিল যে, তোমাদের অন্তরে যা আছে, প্রকাশ কর কিংবা গোপন রাখ সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। আয়াতের আসল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমরা স্বেচ্ছায় যেসব কাজ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তার হিসাব নেবেন। অনিচ্ছাকৃত কু-চিন্তা ও ক্রটি-বিচূতি এর অন্তর্ভুক্তই ছিল না। কিন্তু আয়াতের ভাষা বাহ্যতঃ ব্যাপক ছিল। এতে বোঝা যেত যে, অনিচ্ছকৃত ধারণারও হিসাব নেয়া হবে। এ আয়াত শুনে সাহাবায়ে কেরাম অস্থির হয়ে গেলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এতদিন আমরা মনে করতাম যে, আমাদের ইচ্ছাকৃত কাজেরই হিসাব হবে। মনে যেসব অনিচ্ছাকৃত কল্পনা আসে, সেগুলোর হিসাব হবে না। কিন্তু এ আয়াত দ্বারা জানা গেল যে, প্রতিটি কল্পনারও হিসাব হবে। এতে তো শাস্তির কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সাংঘাতিক কঠিন মনে হয়। মহা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতের সঠিক উদ্দেশ্য জানতেন, কিন্তু উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত শব্দের ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলা সমীচীন মনে করলেন না, বরং ওহীর অপেক্ষায় রইলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে আপাততঃ আদেশ দিলেন যে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যে নির্দেশ আসে, তা সহজ হোক কিংবা কঠিন - মুমিনের কাজ হলো তা মেনে নেয়া। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু '‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমত কাজ করলেন; যদিও তাদের মনে এ সংশয় ছিল যে, অনিচ্ছাকৃত কল্পনা ও কু-চিন্তা থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রথমে মুসলিমদের আনুগত্যের প্রশংসা করেন এবং বিশেষ ভঙ্গিতে ঐ সন্দেহের নিরসন করে বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বহির্ভূত কোনো কাজের নির্দেশ দেন না। কাজেই অনিচ্ছাকৃতভাবে যেসব কল্পনা ও কু-চিন্তা অন্তরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, এরপর সেগুলো কার্যে পরিণত করা না হয়, সেসব আল্লাহ্ তা'আলার কাছে মাফযোগ্য। যেসব কাজ ইচ্ছে করে করা হয়, শুধু সেগুলোরই হিসাব হবে। কুরআনে বর্ণিত এ ব্যাখ্যার ফলে সাহাবায়ে কেরামের মানসিক উদ্বেগ দূর হয়ে যায়। [মুসনাদে আহমাদ ২/৪১২, ১/৩৩২, মুসলিম ১২৫]
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদেরকে একটি বিশেষ দো'আ শিক্ষা দিয়েছেন। যাতে ভুল-ভ্রান্তিবশতঃ কোনো কাজ হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের মত শাস্তিও যেন এ উম্মতের উপর না আসে, তার জন্য বিশেষভাবে দোআ করতে বলা হয়েছে।
[২] আলোচ্য আয়াত দু'টি সূরা বাকারার শেষ আয়াত। সহীহ হাদীসসমূহে এ আয়াত দুটির বিশেষ ফযীলতের কথা বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেউ রাতের বেলায় এ আয়াত দু’টি পাঠ করলে তা তার জন্য যথেষ্ট। [বুখারী ৪০০৮, ৫০০৮, মুসলিম ৮০৮] অর্থাৎ বিপদাপদ ও বিভিন্ন প্রকার অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকার জন্য যথেষ্ট।
লাইব্রেরির আর যেখানে রাতের কথা আছে
সকাল ও সন্ধ্যার যিকিরের পোস্টার সালাতের পরের যিকির-এ “তিন সূরা” শিরোনামে আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাসের কথা আছে, প্রতিটি তিনবার। সেখানে যোগ করা হয়েছে: এগুলো ঘুমের আগেও পড়া হয়, হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরের যতটুকু পারা যায় মাসেহ করে। এর সূত্রের লাইনে আবু দাউদ ও তিরমিযীর নাম আছে, মান হাসান সহীহ।
পকেট সঙ্গীর “কুরআন সঙ্গী” সেটে “কখন কী পড়বেন” শিরোনামে একটি ছক আছে; স্থানীয় সংস্করণে এর সারিগুলো ইংরেজিতে ছাপা। প্রতি রাতের সারিতে আছে আয়াতুল কুরসি, আল-মুলক ও আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত; ঘুমের আগের সারিতে তিন সূরা হাতের তালুতে পড়ে শরীরে মাসেহ, তিনবার। শিশুদের সেট “আমার ছোট্ট সঙ্গী”-র “ঘুম ও জাগা” কার্ডে সেই ছোট দু‘আটিই আছে; কার্ডের দ্বিতীয় অংশে শিশুকে বলা হয়েছে ডান কাতে ঘুমাতে, আর বড় কারো সাথে আয়াতুল কুরসি পড়তে।
সূত্র
কুরআনের আয়াত, সূরা ও আয়াত নম্বরে, উপরে দেখানো: ২:২৫৫; ২:২৮৫–২৮৬; ৩৯:৪২। লেখায় উল্লেখিত: সূরা ১১২, ১১৩ ও ১১৪ (আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন-নাস) এবং সূরা ৬৭ (আল-মুলক)।
হাদীস, গ্রন্থ ও নম্বরে, sunnah.com যেভাবে নম্বর দেয়: বুখারী ফাতহুল বারীর নম্বর অনুযায়ী; মুসলিম মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকীর নম্বর অনুযায়ী, আর sunnah.com যেখানে একটি নম্বরকে ভাগ করেছে সেখানে তার বর্ণ (ক = a, খ = b) সহ। লাইব্রেরি প্রতিটি কার্ডে গ্রন্থের নাম দিয়েছে; নম্বরগুলো ওপরে বর্ণিত হাদীসের।
- ঘুমের আগে ওযু, ডান কাতে শোয়া, আর সমর্পণের দু‘আ শেষ কথা হিসেবে: সহীহ বুখারী ২৪৭।
- তিন সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দেওয়া, তিনবার: সহীহ বুখারী ৫০১৭।
- বিছানায় যাওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি: সহীহ বুখারী ২৩১১, বুখারী এটি পূর্ণ সনদ ছাড়া এনেছেন।
- রাতে আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত: সহীহ বুখারী ৫০০৯; সহীহ মুসলিম ৮০৭ক।
- ঘুমের সময় তাসবীহ ৩৩, ৩৩ ও ৩৪: সহীহ বুখারী ৫৩৬১; সহীহ মুসলিম ২৭২৭ক।
- ছোট দু‘আ, আর গালের নিচে হাত রাখা: সহীহ বুখারী ৬৩১৪।
- বিছানা ঝেড়ে নেওয়া: সহীহ বুখারী ৬৩২০; তিনবার: সহীহ বুখারী ৭৩৯৩।
- খারাপ স্বপ্ন: বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা, আশ্রয় চাওয়া, কাত ফেরা: সহীহ মুসলিম ২২৬২।
- পর্দায় পুরো দেখানো দীর্ঘ দু‘আটি: সহীহ বুখারী ৭৪৮৮।
- ভালো ও খারাপ স্বপ্ন, আর কাকে বলা হবে: সহীহ বুখারী ৭০৪৪।
সাবীল লাইব্রেরি থেকে: পকেট সঙ্গী, “ঘুমের সময় ও রাত” ও “আয়াতুল কুরসি” কার্ড, সাথে “কখন কী পড়বেন” ছক ও “আমার ছোট্ট সঙ্গী”-র “ঘুম ও জাগা” কার্ড, লিংক হিসেবে; আদব ও আখলাক, “ঘুম” কার্ড; সালাতের পরের যিকির, তিন সূরার অংশ, লিংক হিসেবে। উপুড় হয়ে শোয়া, সূরা আল-মুলক আর নামাযের পর আয়াতুল কুরসির হাদীসগুলো ওই কার্ডে শুধু গ্রন্থের নামে উল্লেখিত; এখানে সেগুলো বর্ণনা করা হয়নি।
এরপর কোথায় যাবেন
- পকেট সঙ্গী ও আদব ও আখলাক কার্ড হিসেবে প্রিন্ট করে বিছানার পাশে রাখা যায়।
- ঘুম থেকে ওঠার দু‘আ পকেট সঙ্গীর “ঘুম থেকে ওঠা ও ওযু” কার্ডেও আছে। ওই কার্ডের আরেকটি লাইনের অর্থ নিয়ে একটি প্রশ্নের মীমাংসা এখনও হয়নি।
- সূরা আল-মুলক ও সূরা আল-বাকারা কুরআনের পাতায় পড়া যায়।
- সকাল ও সন্ধ্যা পাতায় ওই পোস্টারের সকাল ও সন্ধ্যার যিকির আছে, আর তাসবীহ গণনা দিয়ে ৩৩, ৩৩ ও ৩৪ গুনে রাখা যায়।
সাবীলের মেইলবক্স তৈরি করা হচ্ছে। কেউ তা পড়া শুরু করলেই এই প্রবন্ধে সংশোধন বা মতামত পাঠানোর উপায় দেওয়া হবে।