Al-An'aam
This is a tafsīr in a language other than Arabic as the Quranic Universal Library (QUL, by Tarteel) has it, taken through the open copy of QUL’s data that spa5k/tafsir_api keeps. QUL’s record does not say who wrote or translated it or which printed edition it follows, and states no licence for the text, so the right to show it is not verified. Nobody has compared it with a printed book, and no scholar has reviewed it. Each passage stands beside the verses it comments on, which are the Qur’ān text of Tanzil, shown as it is there. Sabīl did not write or translate any of it.
Text fromQuranic Universal Libraryspa5k/tafsir_apiMITtaken 2026-10-21
وَإِذْ قَالَ إِبْرَٰهِيمُ لِأَبِيهِ ءَازَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا ءَالِهَةً ۖ إِنِّىٓ أَرَىٰكَ وَقَوْمَكَ فِى ضَلَـٰلٍ مُّبِينٍ 74 وَكَذَٰلِكَ نُرِىٓ إِبْرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلْمُوقِنِينَ 75 فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًا ۖ قَالَ هَـٰذَا رَبِّى ۖ فَلَمَّآ أَفَلَ قَالَ لَآ أُحِبُّ ٱلْـَٔافِلِينَ 76 فَلَمَّا رَءَا ٱلْقَمَرَ بَازِغًا قَالَ هَـٰذَا رَبِّى ۖ فَلَمَّآ أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِى رَبِّى لَأَكُونَنَّ مِنَ ٱلْقَوْمِ ٱلضَّآلِّينَ 77 فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَـٰذَا رَبِّى هَـٰذَآ أَكْبَرُ ۖ فَلَمَّآ أَفَلَتْ قَالَ يَـٰقَوْمِ إِنِّى بَرِىٓءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ 78 إِنِّى وَجَّهْتُ وَجْهِىَ لِلَّذِى فَطَرَ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلْمُشْرِكِينَ 79
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।